চোখের সামনে হারানো পৃথিবী

 কিছু সম্পর্ক হয় খুব দ্রুত, একঝলকেই। যেমন ছিল রূপম এবং কৃষ্ণার সম্পর্ক। ছোটবেলা থেকে একে অপরকে চেনা, একসঙ্গে স্কুলে বেড়ে ওঠা, তবে যখন তারা যুবক-যুবতী হয়ে উঠল, তাদের বন্ধুত্ব বদলে যায় প্রেমে। কৃষ্ণা ছিল একেবারে সরল, ভালোবাসার ভেতর ডুবে থাকা মেয়ে। রূপমের চোখে ছিল সেই যুবক বয়সের মুগ্ধতা—মিষ্টি হাসি, হালকা চেহারা, আর কিছুটা গম্ভীর। কিন্তু কৃষ্ণার প্রতি তার অনুভূতি ছিল গভীর, সত্যি ভালোবাসা। সে কৃষ্ণাকে কখনোই কোনো দুঃখে ফেলতে চায়নি। তবে, মানুষের হৃদয় এমন কোনো স্থির জায়গা নয়, যেখানে কখনো ভেঙে না পড়বে। একদিন, রূপমের জীবনে অপর্ণা নামে এক মেয়ের আগমন ঘটে। অপর্ণা ছিল রূপমের কলেজের বন্ধু, আধুনিক এবং প্রাণবন্ত, যাকে রূপম প্রথমবার দেখেছিল খুবই আকর্ষণীয়। সময়ের সাথে সাথে অপর্ণা তার কাছে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই মুহূর্তে রূপম বুঝতে পারেনি যে, তিনি কিভাবে তাকে জীবনের অন্য পথে টেনে নিতে যাচ্ছেন। একদিন, রূপম সোজাসুজি কৃষ্ণাকে জানিয়ে দেয়, "কৃষ্ণা, আমি অপর্ণাকে ভালোবাসি। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।" কৃষ্ণা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মাথায় যেন সবকিছু ঘুরে যাচ্ছিল। সে জানত না কি বলবে। তার পুরো পৃথিবী যেন ধসে পড়ল। সে চেষ্টা করল বোঝাতে, "রূপম, তুমি কি সত্যিই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? আমাদের মধ্যে এত কিছু ছিল, এত স্মৃতি, এত ভালোবাসা।" রূপম একবারও চিন্তা না করে বলল, "কৃষ্ণা, আমি চাইছি অপর্ণাকে। আমি জানি, তোমার জন্য এটা কঠিন, কিন্তু আমি আর তোমার সাথে থাকতে পারব না।" কৃষ্ণা তার চোখে কান্না আটকে রেখে বলল, "তুমি কি মনে করো, আমি তোমাকে সহজে ছেড়ে দেব? তুমি আমাকে এতদিন বিশ্বাস দিলে, আর আজ তুমি আমাকে এতটা বিশ্বাসঘাতকতা করছ?" রূপম তার কথা শোনে না, কারণ তার মন ছিল পুরোপুরি অপর্ণার দিকে। সে কৃষ্ণাকে একের পর এক ব্যথা দিয়ে চলে গেল, তার জীবন থেকে অনেক স্মৃতি মুছে দিয়ে। বছরগুলি চলে গেল। কৃষ্ণা রূপমকে না পাওয়ার পর, এক গভীর শূন্যতা অনুভব করেছিল। সে জানত, সে আর কখনো রূপমকে ফিরে পাবে না, তবে তা মানতে সে পারছিল না। প্রতি রাতে সে ঘুমাতে যেত, তার চোখে সেই স্মৃতির ছবি, সেই হাসিমুখ, সেই ভালোবাসা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক কষ্টের। রূপম যে তাকে ধোঁকা দিয়েছে, সে সেটা কখনোই ভুলতে পারবে না। কৃষ্ণা প্রতিজ্ঞা করেছিল, সে আর কখনো প্রেম করবে না। তার জীবন থেমে ছিল রূপমের জন্য, কিন্তু সেই রূপম যে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। কৃষ্ণা একাকী বেঁচে থাকল, বছরের পর বছর একে অপরকে ভুলতে চেষ্টা করেও কখনো পারেনি। তার বাবা-মা চেয়েছিল তাকে বিয়ে করতে, কিন্তু সে কখনোই কাউকে গ্রহণ করতে পারেনি। এদিকে, রূপমের জীবনও সুখে কাটেনি। অপর্ণার সাথে বিয়ে করার পর, তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে। অপর্ণা, যে এত দিন রূপমকে আকর্ষণ করেছিল, একসময় রূপমকে তার জীবনের একটি "ব্যাগেজ" হিসেবে মনে করতে শুরু করে। একদিন, অপর্ণা রূপমকে ছুঁড়ে ফেলল। সে তাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিল, একাকী জীবনে। অপর্ণার মনে হয়েছিল, রূপম এখন আর তার প্রয়োজন নেই। রূপম একদিন বৃদ্ধাশ্রমে বসে ছিল, অন্ধকার আকাশের নিচে। সে বুঝতে পারছিল না কেন তার জীবন এত নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে। সে জানত, অপর্ণা তাকে ফেলে চলে গেছে, তবে সে এই ব্যথার জন্য কৃষ্ণাকে কখনোই দায়ী করতে চায়নি। কিন্তু সে জানত, সে যা করেছে, তা ভুল ছিল। সে কৃষ্ণার বিশ্বাস ভেঙেছে, আর তা কখনো শোধরানো সম্ভব হবে না। একদিন, রূপম যখন নিজের জীবনের খোঁজে ছিল, হঠাৎ এক বৃদ্ধা তাকে বৃদ্ধাশ্রমের আঙিনায় হেঁটে যেতে দেখল। রূপমের চোখে সেই পরিচিত এক দুঃখ ছিল। সেই বৃদ্ধা ছিল কৃষ্ণা। তার বয়সও এখন অনেক বেড়ে গেছে, তবুও তার চোখে সেই আগের মতো এক চিরন্তন দুঃখের ছাপ ছিল। কৃষ্ণা তাকে দেখে চিনতে পারল না প্রথমে। তবে যখন রূপম তার দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল, তখন কৃষ্ণা স্বাভাবিকভাবে একবার তাকিয়ে বলল, "তুমি তো... রূপম?" রূপম এক মুহূর্ত চুপ থাকল, তারপর বলল, "হ্যাঁ, আমি রূপম।" কৃষ্ণার মুখে এক রহস্যময় হাসি খেলে গেল, "তুমি এখানে কী করছ? তুমি তো সবসময় সুখী ছিলে, কেন এখানে এসেছ?" রূপম মাথা নিচু করে বলল, "আমার জীবন এখন আর সুখী নয়, কৃষ্ণা। আমি হারিয়ে গেছি, ভুল করেছি। আমি জানি, আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম, কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছি।" কৃষ্ণা তার চোখে সেই তীব্র কষ্ট নিয়ে বলল, "রূপম, তুমি আজ এখানে এসে এসব বলছ, কিন্তু আমি জানি, তুমি যেভাবে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, সেই কষ্ট আমি কখনো ভুলব না। তুমি আমাকে মিথ্যা দিয়েছিলে।" রূপম তার চোখে গভীর দুঃখ নিয়ে বলল, "আমি জানি, কৃষ্ণা। আমি জানি আমি তোমার বিশ্বাস ভেঙেছি, আমি জানি আমি তোমার জন্য সঠিক ছিলাম না। কিন্তু তুমি যদি আমাকে কিছু ক্ষমা করতে পারো, তবে আমি কিছু চাওয়ার যোগ্য হই।" কৃষ্ণা কিছুক্ষণ চুপ ছিল, তারপর বলল, "রূপম, আমি কখনোই তোমাকে মাফ করতে পারব না। আমার হৃদয় শুধু তোমার জন্য ছিল, কিন্তু তুমি আমাকে মিথ্যা দিয়েছিলে।" রূপম বুঝতে পারল, তার ভুলকে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু তার জীবনের শেষ সময়ে, সে কৃষ্ণার কাছে একটাই অনুরোধ করেছিল—"তুমি যদি কখনো আমাকে ক্ষমা করতে পারো, তবে আমি শান্তি পাব।" কৃষ্ণা তাকে এক পলক দেখল, তারপর চোখে অশ্রু মুছতে মুছতে বলল, "আমি তোমাকে মাফ করতে পারি না, রূপম। কিন্তু আমি তোমাকে শান্তির জন্য একটুখানি দোয়া করতে পারি।" রূপম একটু ধীরে ধীরে বলল, "ধন্যবাদ, কৃষ্ণা।" এভাবেই, তাদের এক সময়ে ভরা সম্পর্কের শেষ হলো, দুই জীবন, দুই মানুষ, দুই পৃথিবী। শেষ

Comments